নতুন ভাষা শিখলে মস্তিষ্ক হবে আরও দক্ষ, নতুন গবেষণা

· Prothom Alo

আমরা তো স্কুলে দীর্ঘদিন দ্বিতীয় একটি ভাষা শিখি। ইংরেজির কথা বলছি। ১২ বছরেও দেখা যায় অনেকে ভাষাটা ঠিকঠাক শিখতে পারে না। নতুন ভাষা শিখতে কিছু শব্দ বা বাক্য শিখলেই হয় না। এর সঙ্গে মস্তিষ্কের অনুশীলনের সম্পর্ক। যত শেখার চেষ্টা করবে, তত শিখবে।

বার্সেলোনায় আয়োজিত ‘ফেডারেশন অব ইউরোপিয়ান নিউরোসায়েন্স সোসাইটিজ’ সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, নতুন ভাষা শিখলে এবং নিয়মিত ব্যবহার করলে মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়। দক্ষ হয়ে ওঠে। এমনকি একাধিক ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্ক বয়সের তুলনায় তরুণ দেখায়। মস্তিষ্কের বয়স কয়েক বছর কমে যায়।

Visit newsbetsport.bond for more information.

গবেষকেরা বলছেন, একাধিক ভাষা জানা মানুষের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ দেরিতে দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা ধীরে ক্ষয় হয়। মানে তুমি যেমন শরীরচর্চা করো, ঠিক একই রকম ব্যায়াম হতে পারে নতুন একটি ভাষা শেখা।

মস্তিষ্কের সারাক্ষণের ব্যস্ততা

কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এলেন বিয়ালিস্টক পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভাষা ও মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, গান গাওয়া বা সংগীতচর্চার মতো কোনো কাজ আমরা হয়তো দিনে কয়েক ঘণ্টা ধরে করি। আগ্রহ থাকলে আরকি। কিন্তু একাধিক ভাষা জানা থাকলে মস্তিষ্ককে প্রায় সারাক্ষণই ভাষা নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই আরেক ভাষা জানা থাকলে বেশি বেশি মানসিক অনুশীলন হয়।

ধরা যাক, তুমি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাই জানো। কারও সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার সময় তোমার মস্তিষ্ক শুধু ইংরেজি নিয়ে কাজ করে না। বাংলা ভাষাটিও তখন মস্তিষ্কে সক্রিয় থাকে। ফলে কোন শব্দটি ব্যবহার করতে হবে, কোন ভাষায় কথা বলতে হবে এবং কোন ভাষার শব্দ এখন বাদ দিতে হবে, সবকিছুর হিসাব কিন্তু মস্তিষ্ককে একসঙ্গে করতে হয়।

পিঁপড়ার পথ খোঁজার কৌশল গবেষণা করে বের করেছে ১৩ বছরের শিক্ষার্থী

স্পেনের বাস্ক সেন্টার অন কগনিশন, ব্রেইন অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজের ভাষাবিজ্ঞান গবেষক লুসিয়া আমোরুসো বলেছেন, একজন দ্বিভাষী মানুষ যখন একটি ভাষায় কথা বলেন বা সেটি শোনেন, তখন অন্য ভাষাটি মস্তিষ্কে ঘুমিয়ে থাকে না। সেটিও সক্রিয় থাকে। আমোরুসো নিজেও স্প্যানিশ, ইংরেজি, ফরাসি ও ইতালীয় ভাষা জানেন। ইংরেজিতে কথা বলার সময় তাঁকেও নিজের মাতৃভাষা স্প্যানিশকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখতে হয়।

এখন এই দমানো কীভাবে হবে? মাথার মধ্যে ভাষা বদলানোর তো কোনো ‘সুইচ’ নেই। বরং একাধিক ভাষা একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে। মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, এখন কোন ভাষাটি ব্যবহার করতে হবে?

ভাষা শেখা বা মনোযোগের অনুশীলন

যিনি একাধিক ভাষায় কথা বলেন, তাঁর মনোযোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বেশি হতে পারে। কোন তথ্য দরকার, কোনটা দরকার নেই, মস্তিষ্কে নিয়মিত একটা অনুশীলন চলে।

একদম শিশু বয়সেই এই অনুশীলন শুরু করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই ভাষায় কথা বলে এমন পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা মাত্র সাত মাস বয়সে ভাষার পরিবর্তন বুঝতে পারে। মনোযোগ কত এটা জানার জন্য পরীক্ষা নিলে এক ভাষায় কথা বলা পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুদের তুলনায় তারা ভালো ফল করে।

তোমার মনে প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এমন হয়? উত্তর সহজ। একাধিক ভাষা জানা মস্তিষ্ক সব সময় একটু কঠিন কাজের মধ্যে থাকে। কোন শব্দটি কোন ভাষার, কোন ভাষায় উত্তর দেওয়া উচিত, অন্য ভাষার শব্দটি কীভাবে আটকে রাখতে হবে, এসব সামলাতে গিয়ে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে।

মহাবিপন্ন বাগাড়ের গল্প

কম কাজ করেও বেশি ফল

শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। তবে একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় একই কাজ কম শক্তি ব্যবহার করে সেরে ফেলে।

এক ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কাজ মেপে দেখা গেছে, দুই ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্কে সামগ্রিকভাবে কম কাজ হয়। তবে মনোযোগটা বেশি। মাহার ভেতরে নির্দিষ্ট জায়গায় বেশি কার্যক্রম দেখা যায়।

অন্য গবেষণাতেও প্রায় একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। মনোযোগের সহজ কিছু কাজের পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। দেখা গেছে, একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্ক এক ভাষা জানা মানুষের তুলনায় কম সক্রিয় থেকেও একই কাজ করতে পেরেছে। এর মানে হতে পারে, একাধিক ভাষা ব্যবহারের অভ্যাস মস্তিষ্ককে আরও দক্ষ করে তোলে।

ছোট বয়সে এই দক্ষতা খুব কাজে না লাগলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, বয়সের কারণে মস্তিষ্কের কাজের গতি কমতে পারে। আবার আলঝেইমার রোগ আছে। এই রোগের মতো কিছু রোগ মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। মস্তিষ্ক যদি আগে থেকেই বেশি দক্ষ থাকে, তাহলে আর বয়স বা রোগের ধাক্কাটা সামলে নেওয়া কঠিন হয় না। দীর্ঘ সময় মাথা ভালোভাবে কাজ করে।

বিশ্বের প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ ৩০০ বছর ধরে চালু আছে কীভাবে

মস্তিষ্কের বয়স কি সত্যিই কমে?

এবার আসা যাক সবচেয়ে মজার প্রশ্নে, একাধিক ভাষা জানলে কি মস্তিষ্ক সত্যিই তরুণ থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা ৮৬ হাজারের বেশি মানুষের মস্তিষ্কের ছবি ও জৈবিক তথ্য ব্যবহার করে মেশিন লার্নিং মডেল তৈরি করেছেন। গত বছর নেচার এজিং জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় তাঁরা ২৭টি ইউরোপীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, যেসব দেশে মানুষ বেশি ভাষায় কথা বলে, সেসব দেশে মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার গতি তুলনামূলক ধীরে।

এখানে আরেকটি মজার বিষয় আছে। যত বেশি ভাষা জানা থাকে, মস্তিষ্ক সুরক্ষা পায় তত বেশি। শুধু একটি ভাষায় কথা বললে দ্রুত মস্তিষ্কের বয়স বাড়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।

তবে এই গবেষণায় দেশভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। মানে একজনের ভাষাজ্ঞান সরাসরি তাঁর মস্তিষ্কের বয়স কতটা বদলেছে, তা নিশ্চিত করা হয়নি। দেশের প্রবণতা বের করা হয়েছে।

এ কারণে পরের গবেষণায় একই গবেষকেরা ৭২৮ জন মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের তথ্য ব্যবহার করেন। ২০২৬ সালে ইউরোপীয় নিউরোসায়েন্স সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনের সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয় এই গবেষণা, যা এখনো বিশেষজ্ঞদের আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়নি।

তবে ফল বেশ মজার। দুই বা তিনটি ভাষায় কথা বলা মানুষের মস্তিষ্ককে গড়ে প্রায় ছয় বছর কম বয়সী বলে মনে হয়েছে। আর যাঁরা চারটি ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের মস্তিষ্কের বয়স প্রায় ১৩ বছর কম বলে অনুমান করা হয়েছে।

অবশ্য এর মানে এই না যে আজ থেকে চারটি ভাষা শেখা শুরু করলেই তোমার মস্তিষ্ক ১৩ বছর তরুণ হয়ে যাবে। গবেষণাটি মস্তিষ্কের বয়সের একটি অনুমানভিত্তিক মাপ নিয়ে কাজ করেছে। এখনো আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আরেকটি মজার তথ্য আছে। একজন যে ভাষাগুলো জানেন, সেগুলো যদি পরস্পরের বেশি কাছাকাছি হয়, মস্তিষ্কের সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্ক তত বেশি হতে পারে। কারণ, কাছাকাছি ভাষাগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে মস্তিষ্ককে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। যেমন বাংলা ও অসমিয়া।

দল না পাওয়া সেই দিওমান্দে কীভাবে রিয়াল মাদ্রিদের সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হলেন

ডিমেনশিয়া থেকে সুরক্ষা

মস্তিষ্ক বেশি কাজ করার একটি সুবিধা হলো ‘কগনিটিভ রিজার্ভ’। মানে, বয়স বা রোগের কারণে মস্তিষ্কে পরিবর্তন হলেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার বেশি ক্ষমতা থাকবে।

দেখা গেছে, একাধিক ভাষায় কথা বলা মানুষের ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার রোগ ধরা পরে দেরিতে। কিছু গবেষণা বলছে, এই ব্যবধান চার-পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। মস্তিষ্কে আলঝেইমারের মতো পরিবর্তন দেখা গেলেও দুই ভাষায় কথা বলা ব্যক্তি কয়েক বছর পর্যন্ত এর প্রভাব জীবনে তুলনামূলক কম অনুভব করেন।

এর মানে অবশ্য এই না যে ভাষা শিখলেই ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমার হবে না। এটি হলো, মস্তিষ্কে পরিবর্তন হলেও তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য কিছুটা বেশি সক্ষমতা থাকবে।

হ্যারি পটার সিরিজের ডবির সমাধি বাঁচাতে সরাতে হলো ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের বিদ্যুৎ প্রকল্প

এখনই নতুন ভাষা শেখা শুরু করব?

নতুন ভাষা শেখার আসলে কোনো বয়স নেই। যেকোনো বয়সে যে কেউ শেখা শুরু করতে পারে। বুড়ো হলেও নতুন ভাষা শেখা স্মৃতিশক্তি ও চিন্তার নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিছু গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

আর তোমাকে নতুন ভাষায় একেবারে দক্ষ বা সাবলীল হতেই হবে, এমন নয়। যত বেশি সময় ধরে এবং যত নিয়মিত ভাষাটি ব্যবহার করবে, তত বেশি মানসিক অনুশীলন হবে। যেমন তোমরা অনেকেই কোরিয়ান সিরিজ দেখো। জাপানিজ কমিক পছন্দ করো। এই ভাষাগুলো শেখা সহজ হবে তোমাদের জন্য।

শুরু করতে পারো স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে। আবার ভাষা শেখার অ্যাপ আছে। নতুন ভাষার সিনেমা বা সিরিজ দেখতে পারো, গান শুনতে পারো। এতে ভাষাটির উচ্চারণ ও শব্দের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সহজ হবে।

তবে শুরুতে বলেছি, শুধু শব্দ বা বাক্য মুখস্থ করলেই শেখা হবে না। শিখতে হবে ভাষাটা ব্যবহার করে করে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

জাপানের মঞ্চে কিআর গল্প

Read full story at source